
রাজনীতির শিক্ষক: মাহমুদুর রহমান মান্না
বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাজনীতিবিদ অনেক, কিন্তু শিক্ষক খুব কম। ক্ষমতার দাপট দেখানো যায়, পদ-পদবি অর্জন করা যায়, কিন্তু রাজনীতিকে জীবনাচরণে রূপ দেওয়া যায় কেবল কিছু মানুষের পক্ষেই। মাহমুদুর রহমান মান্না সেই মানুষদের একজন – যিনি রাজনীতিকে ক্ষমতার সিঁড়ি নয়, নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
২০২৬ সালের ১৬ জানুয়ারি, শুক্রবার। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে নাগরিক সমাজের দোয়া মাহফিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ছাত্ররাজনীতির কিংবদন্তি, ডাকসুর সাবেক দুইবারের ভিপি ও চাকসুর নির্বাচিত জিএস মাহমুদুর রহমান মান্না। বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে যিনি একটি চলমান অধ্যায়। ঠিক সেই দিনই রাজধানীর উত্তরায় ঘটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সংসদ প্রাঙ্গণ ছেড়ে ছুটে যান ঘটনাস্থলে। নিহত ও আহত মানুষের খোঁজ নেন – একজন ক্ষমতাবান রাজনীতিবিদ হিসেবে নয়, একজন দায়িত্বশীল মানুষের মতো।
সেদিন বিকাল থেকেই তার শারীরিক অসুস্থতা বাড়ছিল। সহযোদ্ধা ও সহকর্মীদের কাছে তিনি বিষয়টি গোপন করেননি। সন্ধ্যায় ব্যক্তিগত আলাপেও তিনি স্পষ্ট করে বলেন – শরীর ভালো নেই। তবু নিজের শারীরিক কষ্টের চেয়ে মানুষের দুঃখ তার কাছে বড় ছিল। রাতের দিকে পরিস্থিতি জটিল হলে তাকে দ্রুত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। তখন নানা গুজব ছড়ায় – হার্ট অ্যাটাকের খবরও আসে। চিকিৎসকদের পরীক্ষায় স্পষ্ট হয়, এটি হার্ট অ্যাটাক নয়; তবে নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। তাকে রাখা হয় সিসিইউতে।
এই হাসপাতাল পর্বটি কেবল একটি চিকিৎসা-ঘটনা নয়; এটি ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের এক নীরব ভাষ্য। কোনো বিশেষ কেবিন নয়, কোনো আলাদা প্রটোকল নয়। সিসিইউ–২-এর সাধারণ ওয়ার্ডে, সাধারণ মানুষের সাথেই চিকিৎসা। অথচ চাইলে তিনি নিতে পারতেন সবচেয়ে উন্নত, ব্যয়বহুল ও আলোকিত প্রটোকল। পরিচিতি, ক্ষমতা, সম্পর্ক – সবই তার ছিল। কিন্তু তিনি তা চাননি। কারণ বিলাস ও প্রদর্শন কখনোই তার রাজনীতির ভাষা ছিল না।
১৯৬৮ সাল থেকে শুরু হওয়া তার ছাত্ররাজনীতি কেবল সময়ের হিসাব নয়; এটি একটি আদর্শিক যাত্রা। ১৯৭২ সালে চাকসুর জিএস হওয়া, ১৯৭৮-৭৯ ও ১৯৮০-৮১ সালে পরপর দুইবার ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হওয়া – এই অর্জনগুলো ক্ষমতার নয়, গ্রহণযোগ্যতার দলিল। জাসদ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক – বাংলাদেশের রাজনীতির বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ছিলেন। আজকের বহু প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ কোনো না কোনো সময়ে তার ছাত্র, সহকর্মী বা সহযোদ্ধা ছিলেন।
হাসপাতালে সাধারণ মানুষ তাকে দেখে বিস্মিত হয়েছে। ডাক্তার ও নার্সদের চোখেও ছিল প্রশ্ন – এত বড় নেতা, অথচ এত সাধারণ কেন? এই বিস্ময়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের রাজনীতির গভীর সংকট। আমরা নেতা চাই, কিন্তু নেতা হতে চাই ক্ষমতার প্রদর্শনে। আমরা রাজনীতি বুঝি বিলাস, প্রটোকল, আধিপত্যের ভাষায়। অথচ রাজনীতির প্রকৃত পাঠটি এখানে – নম্রতা, দায়িত্ববোধ ও মানুষের সাথে এক কাতারে দাঁড়ানো।
মাহমুদুর রহমান মান্না তাই কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন; তিনি রাজনীতির শিক্ষক। সরকারে থাকা তার বহু শুভানুধ্যায়ী আজও তার কাছে নৈতিকভাবে ঋণী। শুধু সরকার নয় – বাংলাদেশের রাজনীতির বড় বড় নামগুলোর সাথেও তার সম্পর্ক ছাত্র-শিক্ষকের। তিনি কাউকে ক্ষমতার শিক্ষা দেননি; দিয়েছেন জীবনাচরণের শিক্ষা।
এই শিক্ষা আজ বড়ই দুর্লভ। আজ ডাকসুর মতো ঐতিহাসিক পদে প্রার্থী হয়েও আমরা দেখি অহংকার, আড়ম্বর ও দাপট। অথচ দুইবারের ভিপি হয়েও মাহমুদুর রহমান মান্না ছিলেন নিরাভরণ, নিরহংকার। এমনকি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষেও তার রাজনীতি ছিল ভদ্র ও সংযত।
প্রশ্ন থেকে যায় – এই প্রজন্ম কি সেই শিক্ষা গ্রহণ করছে? আমরা কি রাজনীতিকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে নিতে পারছি? নাকি রাজনীতি ক্রমেই বিলাসবহুল জীবনের হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে?
রাজনীতি মানে ধান্দা নয়।
রাজনীতি মানে প্রটোকল নয়।
রাজনীতি মানে ক্ষমতার প্রদর্শনী নয়।
রাজনীতি মানে মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো জীবনযাপন করে মানুষের জন্য কিছু করে যাওয়া। এই সহজ সত্যটি যতদিন আমরা না বুঝব, ততদিন রাজনীতির শিক্ষক থাকবেন – কিন্তু শিক্ষার্থী তৈরি হবে না।
এই লেখাটা একজন মানুষের অসুস্থতার বিবরণ নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একটি নৈতিক আয়না।
—
ভোর ৬ টা। সিসিইউ, পিজি হাসপাতাল, ঢাকা।
– তানভীর ইসলাম স্বাধীন
সদস্য সচিব
নাগরিক ছাত্র ঐক্য
কেন্দ্রীয় সংসদ